জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কমিটি হচ্ছে শিগগিরই। দুই বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবার নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পথে ছাত্রদল। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকা ছোট করে আনা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের যাচাই-বাছাইয়ের পর যে কোনো সময় ঘোষণা হবে কমিটি।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনসহ সংগঠনের শীর্ষ তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন। নতুন নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে তাদেরও মতামত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের সবাইকে বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। এ কারণে অতীতের অনেক কমিটিতে বিএনপির কতিপয় নেতার সমন্বয়ে গঠিত ‘সিন্ডিকেট’ নামে একটি গোষ্ঠী যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, এবার সেই সুযোগ থাকছে না বললেই চলে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই এবারের কমিটি ঘোষণা করা হবে।
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে ছাত্রদল ও বিএনপির একাধিক সূত্র বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের দেখা করা ছিল সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে বিদায়ী সাক্ষাতের অংশ। বৈঠকে নতুন নেতৃত্বে কাদের আনা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বর্তমান নেতাদের কাছে পরবর্তী নেতৃত্বে আসতে পারে, এমন কয়েকজনের নামও নিয়েছেন তারেক রহমান। সেই নামগুলোসহ সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যায়ে আছে। শিগগিরই প্রথমে পাঁচ সদস্যের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা হতে পারে।
১৭ বছর পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যেও বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। বর্তমানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় একটি অংশ অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। গ্রেপ্তার হয়ে জেলে গিয়েছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই তখন আন্দোলনে থেকে নানাভাবে আলোচনায় এসেছেন। এতে করে যোগ্য অনেক প্রার্থী থাকায় নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াও চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শেষ মুহূর্তের আলোচনায় যাঁরা
নতুন কমিটির শীর্ষ পদে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্তত ১৫ জন নেতার নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির দুই নম্বর সহসভাপতি এ বি এম ইজাজুল কবির (রুয়েল), সহসভাপতি মনজুরুল আলম (রিয়াদ), সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম (জিসান), ইব্রাহিম খলিল ও রাজু আহমেদ আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, এক নম্বর সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার (অনিক), জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন (শাওন) এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খানের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এর বাইরে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম (সোহেল), এইচ এম আবু জাফর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম (তারিক), আবদুর রহিম (রনি), ফারুক আহমেদ, শরীফ প্রধান (শুভ) ও মো. সোহেল রানা এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ (প্রিন্স) নিয়েও আলোচনা আছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতার দুজন জানিয়েছেন, নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাছাইয়ে এবার সম্ভাব্য নেতাদের আন্দোলনের ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষাজীবন ও অতীত কর্মকাণ্ড আলাদাভাবে যাচাই করা হয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা, সারা দেশে যোগাযোগ এবং ভালো কথা বলতে পারাটাও নেতৃত্ব নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, এবার নেতৃত্ব বাছাইয়ের বড় মানদণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে দীর্ঘ প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কে সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, কে মামলা, গ্রেপ্তার বা চাপের মধ্যেও সক্রিয় ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কার ভূমিকা কেমন ছিল—তা যাচাই করা হচ্ছে। এর সঙ্গে দেখা হচ্ছে শিক্ষাজীবন, একাডেমিক ফলাফল, পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক আচরণ এবং কোনো বিতর্ক বা অভিযোগ আছে কি না। তবে শীর্ষ দুই নেতৃত্বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা ও অবদান রাখা নেতারা নতুন কমিটিতে এগিয়ে থাকবেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য অতীতে কারা কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে কাজ করার সক্ষমতা কার আছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অতীতে ছাত্রদলের কমিটি গঠনে ‘সিন্ডিকেট’ বানিয়ে বিভিন্ন পক্ষ ও গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এসেছে। অবশ্য এবারের চিত্র এখন পর্যন্ত ভিন্ন। নতুন কমিটি ঘিরে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট সাবেক নেতা, আঞ্চলিক হিসাব কিংবা ‘সিন্ডিকেটের’ নাম প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সম্ভাব্য নেতাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অতীত যাচাইয়ের বিষয়টিই বেশি আলোচনায় রয়েছে।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, শ্যামল মালুমকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আমানউল্লাহ আমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সে হিসাবে রাকিবুল-নাছির কমিটির মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। এরপর প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই দায়িত্ব পালন করছে।




